শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬, ০১:৪২ পূর্বাহ্ন
Reading Time: 3 minutes
মাসুদ রানা রাব্বানী,রাজশাহী:
রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে লাখ লাখ টাকার হাজতি বানিজ্যসহ চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, করাগারে থাকা হাজতিদের এক ওয়ার্ড থেকে আরেক ওয়ার্ডে বদলি ও সুস্থ হাজতিদের কেন্দ্রীয় কারাগারের হাসপাতালে রেখে লাখ লাখ টাকার বানিজ্য চলছে। আর এসব টাকা কিছু অসাধু কয়েদি ও জেলখানার কিছু কর্মকর্তারা ভাগ বাটোয়ারা করে নিচ্ছেন প্রতিমাসে।সা¤প্রতিক জেল থেকে বের হয়ে আসা গোদাগাড়ীর ইকু, জুনায়েদসহ বেশ কিছু হাজতির কাছ থেকে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার বর্তমানে অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। জেলখানার কেস টেবিলের ওয়েটার কয়েদী মানিক, নাসির এবং কারারক্ষী সুবেদার শাহ্ জালাল ও সালামের যোগসাজসে বিভিন্ন হাজতিদের এক ওয়ার্ড থেকে আরেক ওয়ার্ডে বদলি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এরা হাজতিদের কখনও সিভিল থেকে পদ্মা ওয়ার্ডে, যমুনা ওয়ার্ড থেকে অন্য ওয়ার্ডে তাদের ইচ্ছা মতো বদলি করে টাকা দাবি করে থাকে কয়েদিদের কাছে।এছাড়াও বিভিন্ন ওয়ার্ডে হাজতিদের বদলি করতে ১ থেকে ২ হাজার টাকা টাকা নেয়। আবার ১-২ মাস পরে হাজতিদের থাকা ওয়ার্ড কেটে দিয়ে পুনরায় টাকা নিয়ে নতুন ওয়ার্ডে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। আর এসব টাকা সুবেদার ও বাবুদের মাধ্যমে ভাগ বাটোয়ারা করে থাকে তারা। কারাগারের কেস টেবিলের ওয়েটার কয়েদি মানিক ও নাসির এবং কারারক্ষী সুবেদার শাহ্ জালাল ও সালাম র্দীঘদিন যাবত এভাবেই লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।সা¤প্রতিক এক কারারক্ষীর অর্থ হাতিয়ে নেয়ার একটি অডিও ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কেন্দ্রীয় কারাগারের চাল অবৈধ ভাবে পাচারকালে মোহনপুর থানা পুলিশ আটক করেছিলো। পরে কারাগারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে ছাড় পায় ট্রলিসহ চালক। এর পাশাপাশি হাসপাতালের কয়েদি অথবা হাজতিদের দেখা করতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হতে হয় অনেক মানুষকে।অপরদিকে, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের হাসপাতাল নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের মেডিকেল কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা টাকা পেলেই সুস্থ হাজতিদের হাসপাতালে বেড দিয়ে দেয়। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের হাসপাতালে সুস্থ হাজতিদের জন্য কর্তব্যরত ডাক্তার মনে করলেই বন্দীদের হাসপাতালে রাখার ব্যবস্থা করতে পারেন। অসুস্থ হাজতিদের চিকিৎসার জন্য ২০০ শয্যার হাসপাতাল থাকলেও অধিকাংশ বন্দী টাকার বিনিময়ে হাসপাতালে থাকার সুযোগ পায়। এজন্য তাদের মাসে আগে গুণতে হয় ৫ হাজার টাকা। বর্তমানে সেই টাকার পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৭ হাজার টাকায়।রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে কোন কয়েদি ও হাজতি যদি অসুস্থ হয় তাহলেই হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেয়ার নিয়ম জেল কোড অনুসারে। কিন্তু কারাগারের হাসপাতালে সুস্থ হাজতিদের মাসিক চুক্তিতে রেখে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে হাসপাতালের কর্মরত ডাক্তারসহ অন্যানরা। একজন সুস্থ হাজতিকে ১ মাস হাসপাতালে রেখে ৭ হাজার টাকা করে নিয়ে থাকে হাসপাতালের ডাক্তার। এছাড়াও কোন প্রেসকিপশন ছাড়া এক প্যাকেট সিগারেট দিলে দেয়া হয় ঘুমের ঔষধ। এ ভাবে লাখ লাখ টাকার বানিজ্য চলছে কেন্দ্রীয় কারাগারের হাসপাতালে।রাজশাহীর পবা উপজেলার বায়া এলাকার রফিক নামের এক কয়েদি জানান, আমি ১ মাস হাসপাতালে ছিলাম ৭ হাজার টাকা দিয়েছি। আমার ১ মাস পূরন হতে আরো ৭ দিন বাকি ছিলো কিন্তু জামিন হয়ে গেছে। হাসপাতালে থাকরার জন্য ফার্মাসিস্ট এর সাথে কন্ট্রাক করে বাইরে থেকে টাকা দেয়ার পরে আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। জেল হাসপাতালের রাইটার হিসাবে আছে কয়েদি চন্দনসহ আরো কয়েকজন। তাদের এক প্যাকেট ডারবি সিগারেট দিলে তারা ঘুমের ঔষধ মাইলাম ২-৩টা করে দিয়ে থাকে। সেটা খেয়ে একটু ঘুম ভালো হয় এ জন্য চাহিদাও রয়েছে।অভিযোগ রয়েছে, জেল থেকে কয়েদি অথবা হাজতিদের পরিবারের সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলার নিয়ম আছে ৭ দিনের মধ্যে ১ দিন। কিন্তু ১ হাজার টাকা দিলে ৭ দিনের মধ্যে ৩ দিন কথা বলার সুযোগ করে দেয়া হয়। এভাবে মোবাইল অপারেটর লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। জেল থেকে ফোনে কথা বলার এমন সুযোগের কারণে জেলে থাকা র্শীষ মাদক কারবারীরা বাইরের মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রন করছে।সা¤প্রতিক, রাজশাহীর বাঘা উপজেলা র্শীষ মাদক কারবারী চপল ও ভারতের মাদক কারবারী গ্রেপ্তার হয়ে জেল হাজতে ছিলেন। চপলের জামিন হলেও ভারতের ওই নাগরীকের জামিন হয়নি। চপল জেলে থাকা অবস্থা তার ভাই সিদ্দিকের সাথে কথা ফোনে কথা বলে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রন করতেন।এছাড়া কেন্দ্রীয় কারাগারে হাজতিদের খাবারের মান খুব নিম্নমানের। হাজতিদের সকালে রুটি, গুড় ও সবজি দেয়া হয়। রুটি সেদ্ধ হয় অর্ধেক আর অর্ধেক থেকে যায় কাঁচা। দুপুরের খাবার সকাল ১১টার দিকে ডাল, সবজি ও ভাত দেয়া হয় মাঝে মাঝে মাছ ও মাংস দেয়া হয়। আর হাজতিদের রাতে খাবার দুপুর ৩টার দিকে দেয়া হয় এবং ৬টার মধ্যে খেয়ে নিতে হয়। না হলে খাবার নষ্ট হয়ে যায়। কখনও ভাতের সাথে একপিচ ছোট ভাজা মাছ, কোন সময় একপিচ মাংস, কোন সময় ব্রয়লার মুরগির মাংস ও সাথে সবজি, পাতলা ডাল দেয়া হয়। হাজতি ও কয়েদিদের নামে যে পরিমাণ খাবার বরাদ্দ থাকে সরকারি ভাবে সেই পরিমাণ মানসম্মত খাবার দেয়া হয়না তাদের বলেও অভিযোগ রয়েছে।এসব বিষয়ে জানতে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার আব্দুল জলিলের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।তবে কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার নিজাম উদ্দিন বলেন, এমন অভিযোগ সঠিক না। তবে এমন কর্মকান্ডে জড়িতোদের তদন্ত করে দ্রæত ব্যবস্থা নেয়া হবে। কোন কায়েদি বা হাজতি যদি জেল কোর্ডের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।কেন্দ্রীয় কারাগারের হাসপাতালের সহকারি সার্জন আরেফিন সাব্বিরের সাথে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি তাকে।সুস্থ কয়েদি হাসপাতালে রেখে এক মাস ৭ হাজার টাকা করে নেয়ার বিষয়ে কেন্দ্রীয় কারাগারের ডাক্তার মিজানুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি হাসপাতালে আর নেই। আমার বদলি হয়েছে কারা প্রশিক্ষন একাডেমিতে। যারা ওই হারাম টাকা খায়, তাদের কে বলেন। আমি কোন হারাম টাকা খাই না।